অক্টোবরের এক রাত
অনুবাদ: রেখা চট্টোপাধ্যায়
সহরের চেয়ে গ্রামে লেখার কাজ করা সর্বদাই সহজ বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। মনে হয় গ্রামের সব কিছুই একাগ্রতার সহায়ক, এমন কি ছোট্ট বাতিটার পল্তের পটপট শব্দ এবং বাইরের বাতাসের হুঙ্কার, অথবা সময় সময় সেই পরিপূর্ণ স্তব্ধতা যখন মনে হয় পৃথিবী বুঝি গেছে থেমে এবং অসীম শূন্যতার মধ্যে রয়েছে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে।
তাই ১৯৪৫-এর শরতের শেষ রিয়াজান ছাড়িয়ে এক গ্রামের জন্য আমি যাত্রা করলাম। সেখানে ছিল এক পুরোনো বাগান বাড়ী আর আগাছা ভরা বাগান। সেখানে থাকতেন ভাসিলিসা ইওনভ্না নামে রিয়াজান-এর এক ভূতপূর্ব গ্রন্থাগারিক। যখনই আামি কাজ করতে চেয়েছি প্রায়ই তার সঙ্গে থেকেছি আমি। প্রত্যেকবার এসেই দেখেছি বাগানটার অযত্ন বেড়ে উঠেছে এবং বাড়ী ও তার কর্ত্রীর বয়স স্পষ্টই উঠেছে বেড়ে।
শেষ ইস্টিমারে আমি মস্কো ছাড়লাম। যতদূর চোখ যায় তামাটে তীর ছড়িয়ে রয়েছে এবং ইস্টিমার থেকে পাঠানো চক্চকে ধূসর ঢেউগুলো ক্রমাগতই দিচ্ছে ধুইয়ে। সমস্ত রাত ধরে বসার ঘরে একটা লাল বাতি জ্বলেছিল।
মনে হলো যেন একাই আমি যাত্রী—ইঞ্জিনিয়ার দলের এক অফিসার ছাড়া অন্যান্য যাত্রীরা কদাচিৎ তাদের তপ্ত কেবিন ছেড়ে বাইরে আসতে সাহস করছিলেন না। তাঁর জল-ঝড়ে পোড়-খাওয়া মুখের উপর জীবন্ত দুটি চোখ। ডেকের উপর তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিলেন এবং তৃষিত নয়নে তীরের দিকে তাকাচ্ছিলেন।
শীতের জন্যে অপেক্ষা করছে সবকিছু; গাছগুলো নিষ্পত্র, ঘাসগুলো নেতিয়ে পড়েছে এবং নোটা মোটা ডাঁটাগুলো কালো হয়ে গিয়েছে। তীরপার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোর চিম্নি থেকে অল্প অল্প ধোঁয়া উঠছে। নদীটাও অপেক্ষা করে রয়েছে। প্রায় সর্বত্রই উপসাগরের আরো ভিতরে জাহাজঘাটগুলিকে হয়েছে নিয়ে যাওয়া, বয়াগুলোকে হয়েছে সরানো, শুধু চাঁদের মৃদু আলোয় আমাদের ইস্টিমার পথ দেখে চলছিল।
অফিসারের সঙ্গেে আমি গল্প জুড়ে দিলাম। এ কথাটা জেনে খুসি হলাম যে দুজনেই আমরা চলেছি জাবরিয়েতে। নভসিয়ল্কিতে নেমে, খেয়ানৌকোয় ওকা পার হয়ে মাঠ পেরিয়ে আমরা জাবরিয়ে পৌছুবো। নভসিয়ল্কিতে ইস্টিমারটা পৌঁছুবে সেই সন্ধেয়।
তিনি বললেন, ‘আসলে আমি জাবরিয়েতে যাচ্ছি না, যাচ্ছি আরো দূরে শ্বেত হ্রদের বন-রক্ষী ঘাঁটিতে। কিন্তু জাবরিয়ে পর্যন্ত আমরা একসঙ্গে যাবো। যদিও বয়েসকালে আমি যুদ্ধে গিয়েছি আর অনেককিছু দেখেছি তবু একলা ঐ বনের ভেতর দিয়ে যেতে হবে না ভাবতেই ভালো লাগছে। লড়াই-এর আগে আমি বন-রক্ষী ছিলাম। এখন সৈন্যদল থেকে ছাড়া পেয়ে আমার পুরোনো জায়গায় ফিরছি। বনের মধ্যে কাজ করার চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে। বন সম্বন্ধে বিশেষ শিক্ষা আমি পেয়েছি। আপনি সেখানে এসে আমার সঙ্গে দেখা করবেন। এমন সব জায়গা আপনাকে দেখাবো যে আপনি অবাক হয়ে যাবেন। লড়াই-এর সময় প্রায় প্রতিরাত্রেই তাদের স্বপ্ন দেখতাম।’
তিনি হাসলেন এবং তাইতে মনে হলো যেন তাঁর বয়েস অনেক কমে গেছে।
সন্ধে উৎরে যাবার মুখে নভসিয়ল্কিতে ইস্টিমার থামলো। বাতি হাতে এক প্রহরী ছাড়া জাহাজঘাট জনশূন্য। যাত্রীদের মধ্যে কেবল জুয়েভ আর আমি নামলাম। ঘাটের ভিজে তক্তাগুলোর ওপর আমাদের ঝোলাগুলো নিয়ে লাফিয়ে নামার সঙ্গে সঙ্গেই ইস্টিমার ছেড়ে দিলো। তার বাষ্পের ধোঁয়ায় আমরা ঢাকা পড়ে গেলাম। প্রহরীও সঙ্গে সঙ্গে তার বাতিটা নিয়ে চলে গেল। আমরা দুজনে পড়ে রইলাম।
জুয়েভ বললেন, ‘তাড়াহুড়োর দরকার নেই। ঐ কাঠগুলোর ওপর বসে ধূমপান করা যাক।’
তাঁর হাবভাব দেখে মনে হলো তাড়াহুড়ো করতে তাঁর ইচ্ছে নেই: তাঁর স্বর, যে ভাবে ব্যগ্র হয়ে তিনি নদীর সোঁদা বাতাস বুক ভরে নিচ্ছিলেন, এবং নদীর মোড়ের ওপারে ইস্টিমারের ছোট্ট ভোঁ রাত্রির মধ্যে প্রতিধ্বনিত হয়ে হয়ে ওকার অরণ্যে হারিয়ে যেতে শুনে তাঁর হাসি—এ সমস্তই। অতি প্রিয় ও অতি পরিচিত জায়গায় ফিরে তাঁর আনন্দ আর ধরে না।
ধূমপান শেষ করে খাড়া তীর বেয়ে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments